শুক্রবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ || সময়- ২:৫১ am

তারেক কি বিএনপির জন্য ‘বোঝা’ হয়ে উঠেছেন ?

অনলাইন ডেস্ক/কথা ছিল তাঁর জন্মদিনে বিএনপি উৎসব করবে। সারাদেশে র‌্যালি, সমাবেশ করে বিএনপি তার শক্তি জানান দেবে। কিন্তু এসব কিছুই হয়নি। তারেক জিয়ার জন্মদিন পালিত হলো নীরবে, চুপিসারে। রাত ১২টায় কেক কেটে ছোট্ট উৎসবের আয়োজন করা হলো। একটা আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ব্যস, এটুকুই।

৫৩ বছরে পা দেওয়া তারেক জিয়াকে নিয়ে বিএনপিতে অস্বস্তি খুবই স্পষ্ট। প্রশংসার চেয়ে, তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সাফাই গাইতেই তাদের গলধঘর্ম অবস্থা হয়। সিনিয়র নেতারা তাঁকে নিয়ে কথা বলতেও কুণ্ঠা বোধ করেন। তারেক জিয়া কি তাহলে বিএনপির বোঝা? প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বিএনপির অধিকাংশ সিনিয়র নেতাই মনে করেন, তারেক জিয়ার জন্যই বিএনপির এই দূরাবস্থা। তারেক জিয়াকে নিয়ে এগুনো খুব কষ্টকর।

১৯৯১ সালে বিএনপি যখন ১০ বছর পর ক্ষমতায় আসে, তখন তারেক নিজেকে একজন ব্যাবসায়ী হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। প্রথমে মামা সাঈদ ইস্কান্দারের সঙ্গে ড্যান্ডি ডায়িং নামে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রভাব খাটিয়ে সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। এ সময় কোকো লঞ্চ চালু করেন তারেক জিয়া। ৯১-৯৬ সালে কোকোর ছয়টি লঞ্চ নামান তিনি।

৯৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা হারালে, তারেক রাজনীতিতে সরাসরি আসেন। ২০০১ সালের নির্বাচনকে ঘিরে গড়ে তোলেন নিজস্ব টিম। ২০০১ সালের নির্বাচনের বিজয়ের অন্যতম মাস্টার মাইন্ড মনে করা হয় তারেক জিয়াকে। ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্যই গড়ে তোলেন ‘হাওয়া ভবন’।

বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারেক জিয়াই হয়ে ওঠেন সরকারের নিয়ন্ত্রক। বেগম জিয়াকে পুতুল বানিয়ে তারেক জিয়া হাওয়া ভবনের মাধ্যমে গড়ে তোলেন প্যারালাল সরকার। নিয়োগ, বদলী বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, ব্যাংক দখল সহ সব আর্থিক অনিয়মেই উঠে আসে তারেক এবং তাঁর বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের নাম। ক্রমশ: তারেক হয়ে ওঠেন মিস্টার টেন পারসেন্ট। তাঁকে হিস্যা না দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য অসম্ভব হয়ে ওঠে।

একদিকে অর্থ, কালো টাকার পাহাড় অন্যদিকে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার মিশন ছিল তারেক জিয়ার। আর বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটান। এছাড়াও শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ এমপি সহ অন্তত ১২ টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তারেকের হাত আছে বলে মনে করা হয়। ভবিষ্যতের নেতা হবার যে প্রত্যাশায় তারেক রাজনীতির যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা ক্রমশ: ধুসর হয়ে পড়ে। তারেক হয়ে ওঠেন একজন গডফাদার ও দুর্নীতিবাজ। এরশাদকে পেছনে ফেলে তারেক জিয়াই হয়ে ওঠেন দুর্নীতির বরপুত্র। মূলত: হাওয়া ভবনের স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, লুটপাট এবং বিরাধী দলের বিরুদ্ধে দমন নীতির কারণেই বিএনপি দ্রুত জনপ্রিয়তা হারায়। বিএনিপির প্রায় সকলেই মনে করেন, ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেন এসেছিল তারেক জিয়া ও তাঁর বন্ধুদের জন্যই।

ওয়ান ইলেভেনে বন্দী হন তারেক জিয়া। জীবনে আর রাজনীতি করবেন না, এই মুচলেকা দিয়ে তিনি লন্ডনে চলে যান। সেই থেকে প্রায় ১০ বছরে লন্ডনে আছেন। এখন তিনি লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন। সবাই আশা করেছিলেন, জেল, নির্যাতন তারেককে বদলে দেবে। লন্ডনে অতীত ভুলের কথা চিন্তা করে তারেক নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলবে। কিন্তু লন্ডনে তারেক জিয়া আরও বিভৎস ও হিংস্র হয়ে ওঠেন। রাজনীতির স্বাভাবিক শিষ্টাচার, ভব্যতা, শালীনতাগুলো উপড়ে ফেলেন। এই তরুণ যে ভাষায় প্রয়াত নেতৃবৃন্দ, সিনিয়র নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে কথা বলেন তাতে বিএনপির নেতারাই বিব্রত বোধ করেন। ইতিহাস বিকৃতি, অশোভন খিস্তি খেউরের কারণে বিএনপির অনেক নেতাই আত্মসম্মান বাঁচাতে তাকে এড়িয়ে চলেন।

বিপুল বিত্তশালী তারেক জিয়ার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন, জঙ্গি সংগঠনের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিম তাঁর ব্যবসায়িক পার্টনার বলেও ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ওয়ান ইলেভেন সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল তারেক রহমানের দুর্বৃত্তায়নের কারণেই। এখনো বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা বিএনপিকে বিকল্প শক্তি হিসেবে মেনে নিতে পারেনা শুধুমাত্র তারেক জিয়ার কারণেই। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তাঁর সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরে বেগম জিয়াকে তাঁর পুত্রের ব্যাপারে ইঙ্গিত করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তারেক জিয়াকে বিএনপি থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।

বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ‘তারেক জিয়া বিএনপিতে থাকলে বিএনপির কোনো ভবিষ্যত নাই। তাঁর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলে চরম নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।’

সম্পদ নয় তারেক জিয়া এখন বিএনপির বোঝা। এই বোঝা কতোদিন বইবে বিএনপি, সেটাই দেখার বিষয়।

আর্কাইভ