মঙ্গলবার ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ || সময়- ৬:১২ am

পাকিস্তানি শরণার্থীর ছেলে থেকে বলিউড বাদশা এখন বড় ব্যবসায়ী...!

 অনলাইন ডেস্ক/অভিনেত্রী নেহা ধূপিয়া একবার মন্তব্য করেছিলেন, ‘অনলি সেক্স অ্যান্ড শাহরুখ সেলস ইন ইন্ডিয়া’। ভারতের বাজারে BRAND SRK (শাহরুখ খানের পরিচিতি) এর দাপট মাথায় রেখেই এই মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

সেন্ট কলম্বা স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর শাহরুখ দিল্লির হংসরাজ কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন লাভ করেন। গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি পাওয়ার পর তিনি গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনার জন্য দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। যদিও তিনি ডিগ্রিটা শেষ করতে পারেননি।

শাহরুখ ভালোবাসতেন বিজ্ঞাপন জগতকে। ৬০ সেকেন্ডে একটা গল্প বলার ব্যাপারটা তাকে আকর্ষণ করত। প্রথমবারের মতো শাহরুখ ১৯৮৯ সালে লিবার্টি সুজ এর একটি বিজ্ঞাপনে অংশ নেন। ফিল্ম তারকা হওয়ার পর শাহরুখ বিভিন্ন রকমের বিজ্ঞাপনে জড়িয়ে যান। এ কাজ করতে ভালোও লাগত তার। বিজ্ঞাপন জগত থেকে অনেক টাকা কামিয়ে তিনি সিনেমাতে তার সমসাময়িক তারকাদের তুলনায় কম টাকা নিতেন।

আমির খান নব্বই দশকের শেষে ছবিপ্রতি সাত কোটি টাকা পারিশ্রমিক নিতেন। সেখানে শাহরুখকে তিন কোটি টাকা দিলেই চলত। আবার, যশরাজ ফিল্মস ও করন জোহরের মতো কাছের পরিচালকদের ছবি তিনি আরও কম টাকাতেই করে দিতেন।

শাহরুখ টাকা আয় করতেন বিজ্ঞাপন মারফত। পান-মসলার বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে বিলাসবহুল গাড়ি সব পণ্যের প্রচারণাতেই অংশ নিতেন তিনি। নব্বই দশকের শেষ দিকে এসে তিনি বিজ্ঞাপন প্রতি তিনি চার কোটি রুপি নিতেন। যদিও এই দশকের শুরুতে তা ছিল অনেক কম। আর এক পর্যায়ে শাহরুখ ছাড়িয়ে যান-ভারতের বিজ্ঞাপন জগতের সবচেয়ে মূল্যবান দুই তারকা-অমিতাভ বচ্চন ও শচীন টেন্ডুলকারকে।

১৯৯১ সালের মে মাসে ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে শাহরুখ বলেন যে, ‘আমার বাংলোর জন্য টাকা দরকার, সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য টাকা দরকার। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য আমার টাকা দরকার। এটা করতে যেয়ে যে কোনো কিছুর বিজ্ঞাপন আমি স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে করতে পারব’।

এ জিনিসটা মনে রাখা দরকার যে, একজন বলিউড তারকার জন্য বিজ্ঞাপনে অংশ নেয়া মোটেও মানানসই ছিল না। দিলীপ কুমার টিভি বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারতেন না। অমিতাভ বচ্চন টিভি বিজ্ঞাপনে অংশ নেন ১৯৮৬ সালে।

মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে ভারতের বিজ্ঞাপন বাজার

১৯৯১ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভারতে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হয়। টাকার বস্তা নিয়ে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো ভারতের বিজ্ঞাপন জগতকে চাঙ্গা করে তোলে। কোম্পানিগুলো বলিউডকে বেছে নিয়েছিলো তাদের পণ্য প্রসারের মাধ্যম হিসেবে।

পেপসিই প্রথম তাদের পণ্য প্রসারের জন্য বলিউডের দিকে হাত বাড়ায়। ১৯৯৩ সালে আমির খানকে দিয়ে তারা একটি বিজ্ঞাপন বানাতে চায়। পেপসি শাহরুখকে দিয়েই সেটি নির্মাণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞাপন নির্মাতা প্রহলাদ কক্কর দেখলেন শাহরুখ খানের ‘বাজার মূল্য’ আমির খানের তুলনায় কম। শাহরুখকে পাঁচ লাখ রুপি দিলেই হয়, কিন্তু আমির খান দর হাঁকালেন ১৫ লাখ। প্রহলাদ আমির খানকে দিয়েই বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করেন। বিজ্ঞাপনটি বিখ্যাত হয়ে আছে আরেকটি কারণে, সেটা হলো এই বিজ্ঞাপন দিয়েই প্রথম শোবিজ জগতে পা রাখেন বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাই।

কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, এক বছর পরেই পেপসির সাথে আমির খানের ঝামেলা হলো। তিনি পেপসির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ১৯৯৬ সালে শাহরুখের সাথে পেপসির চুক্তি হয়। প্রতিবছরই পেপসির সাথে শাহরুখের নতুন করে চুক্তি সম্পাদিত হয়। পেপসির সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সেলিব্রিটি হয়ে যান শাহরুখ খান।

শাহরুখ নিজেকে ‘মার্কেটিং গুরু’ দাবি করতে ভালোবাসেন। অন্য দুই খান (সালমান-আমির) যেভাবে হেসেখেলে বড় হয়েছেন, শাহরুখের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সেরকম নয়। পাকিস্তানি শরণার্থীর ছেলে, দিল্লির রাজিন্দর নগরে বড় হওয়া এক সংগ্রামী বালক-যে কি না বলিউড বাদশাহ বনে যান কয়েক বছরের মধ্যে-এটা অবশ্যই ব্যক্তিগত ক্যারিশমার পরিচয়।

বিভিন্ন কোম্পানির সাথে চুক্তিপত্র, ব্যবসায়িক লেনদেন সব শাহরুখ খান নিজেই দেখাশোনা করেন। ২০০৫ সালের দিকে শাহরুখ দুবাইয়ের আবাসন ব্যবসায় হাত দেন। শত শত কোটি রুপি আয় করেন এ খাতে। ভারতের ক্রিকেট লীগ আইপিএলে নিজের দল কোলকাতা নাইট রাইডার্সের ব্রান্ড মূল্য অন্য দলগুলোর তুলনায় আকাশছোঁয়া। ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লীগেও শাহরুখের নিজের দল আছে। মুম্বাই নগরীর অভিজাত এলাকা বান্দ্রায় শাহরুখের বাংলো বাড়ি মান্নাতের বাজারমূল্য আছে এই মুহূর্তে এক হাজার কোটি টাকা। শাহরুখ যত বড় তারকা, তত বড় ব্যবসায়ীও বটে।

১৯৯৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত  শাহরুখ প্রিন্ট মিডিয়ার মোট ২৮১ টি বিজ্ঞাপনে আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ১৭২ টি বিজ্ঞাপনে অংশ নেন। তার সমসাময়ির আর কোনো তারকা এর ধারেকাছেও নেই।

আর্কাইভ